Monday, October 22, 2018

''বিশ কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি।'' রবি ঠাকুর তুমি ঠিক বলেছিলে।

আজ আমার জীবনের একটি বিশেষ দিন। তা হয়তো অনেকের কাছে স্বাভাবিক আবার অনেকের কাছে হাসির আবার অনেকের কাছে লজ্জার। তবে আমার কাছে এইটা ছিল লজ্জার। এই দিনটির বর্ণনা কই থেকে শুরু করবো সঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে যাই হোক শুরু তো করতে হবে কেননা এই বিষয়টা সবার জানা দরকার।
তাহলে শুরু করি যতদূর মনে পড়ে,
আজ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি যুদ্ধ শুরু। তাই গত দিনে আসা ক্যান্ডিডেন্ট কে নিয়ে ভার্সিটি যাই। যখন সে পরিক্ষার হলে ঢুকলো তার কিচ্ছুক্ষন পরে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে আমার ফোন বেজে উঠলো। আমি রিসিভ করা মাত্রই বিপরিত পাশ থেকে এক মহিলার আওয়াজ। আমি তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি জানান আমি যে ক্যন্ডিডেট কে সাহায্য করছি তার মা। আমি সালাম দিলাম এবং তাকে অতিব ভদ্র ভাবে জানালাম সে এখন পরিক্ষা দিচ্ছে। ওপাশ থেকে আমতা আমতা ভাবে আমাকে বলা হল “ বাবা তুমি তো রাজশাহীতেই থাকো। তোমার হয়তো অনেক পরিচিত আছে যারা প্রশ্নফাঁস করে শিক্ষার্থীদের সাহায্য করে। দেখতো বাবা এমন ভাবে আমার সন্তানকে একটু সাহায্য করতে পার কিনা”। আমি শোনা মাত্র অবাক হলাম, যে পৃথিবীতে এমনও মা আছে যে কিনা সন্তানের ভবিষ্যৎ এমন ভাবেই তৈরি করতে চান। সঙ্গে সঙ্গে আমি কর্কস ভাবে তার এমন আবদারের জবাব দিলাম। আপনি মেন্টালি সিক? আপনি আমাকে বলছেন প্রশ্নফাস করে আপনার সন্তানকে সাহায্য করতে? আপনার কি কোন কমন সেন্স নাই? আপনি এইটা কি ভাবে আমাকে বলতে পারলেন? আমার কথা ছিল সে দূর থেকে এসেছে তাকে আশ্রয় দেয়া ও তাকে পরিক্ষা হল পর্যন্ত পৌছে দেয়া আর আপনি আমাকে বলছেন তাকে অনৈতিক ভাবে পরিক্ষায় সাহায্য করতে? এরপর উনি আমাকে বিভিন্ন সংগঠনের এমন অপকান্ডের উদাহরণ দিয়ে বলছেন এইটা তুমি বাবা এইভাবে নিচ্ছো কেন? এইটা তো অনেকেই করে। আমি বললাম অনেকেই হতো করে কিন্তু আমি করিনা। সে যেমন পরিক্ষা দিবে সে তেমন ফল পাবে কিন্তু আমি এই ব্যাপারে কোন সাহায্য করতে পারবোনা বলে ফোন রেখে দিলাম।
কিন্তু দিনভর আমি নিজের মধ্যে কেমন জানি একটা অস্তিত্বহীন অনুভব করছি। আর মাথার মধ্যে কয়েকটা প্রশ্ন বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে। এইটা কি আমার দেশ? এই কি আমার শিক্ষা ব্যবস্থা? এই কি আমার সমাজ। তাই বেলা শেষে নিজে ধরে রাখতে পারলাম না। ডায়াল লিষ্ট থেকে ঐ নাম্বার টি খুজে বের করে ফোন দিলাম কিছু প্রশ্নের উত্তর নেয়ার জন্য। শুরুতে আমি আমার নাম বলে পরিচয় দিলাম। অতঃপর তার প্রোফেশন জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি জানালেন উনি তার এলাকার কিন্ডার গার্ডেন স্কুলের একজন শিক্ষিকা। আমি এটা শুনেই অবাক একজন শিক্ষিকা তার সন্তান কে অবৈধ পথ অবলম্বনের উচ্চো শিক্ষা দিতে চান। আমি আবারও জিজ্ঞাসা করলাম যে তাকে কে এই বুদ্ধি বা পরামর্শ দিয়েছে যে আমাকে বললের প্রশ্নফাঁস বা ফাঁস হওয়া প্রশ্ন আমি তার সন্তানকে সাহায্য করবো। উনি তখন পুরা কথাটাই উল্টিয়ে দিলেন এবং আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন উনি এমনটা বলেন নাই। আমি পালটা প্রশ্ন করে বসলাম আপনি আমাকে যে কথা বলেছেন তা তাহলে মিথ্যা? উনি আমতা আমতা করে বলল দেখ বাবা এই দুর্নীতিবাজ সমাজে এতোটা সৎ থাকলে চলতে পারবেনা। আমি আবারো প্রশ্ন করলাম তার মানে কি আমাকে আপনি দুর্নীতিবাজ হইতে বলতেছেন নাকি আমাকে দুর্নীতিবাজ বলতেছেন? আর একটা কথা মনে রাখবে বাংলাদেশে সবাই যদি দুর্নীতিবাজ হইতো তবে বাংলাদেশ আজ বিক্রি হয়ে যেত। আমরা কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থীরা এখনো সৎ আছি বলে বিগত দিন গুলোতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখেছি। আর আপনি একজন শিক্ষিকা হয়ে আপনার সন্তানের জন্য এই রকম অবৈধ কাজ করতে বলছেন সত্যি আপনার জন্য আমার অনেক গর্ব হচ্ছে। এমন শিক্ষিকা আমাদের প্রতিষ্ঠান গুলোতে আছে এইটা জেনে আমি গর্বিত। ভাল থাকবে এরপর থেকে কাউকে এমন আবদার জানানোর আগে একটু বুঝেশুনে করেন না হইলে সমস্যায় পরতে পারেন।
সাবাস বাংলাদেশ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়
''বিশ কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি।'' রবি ঠাকুর তুমি ঠিক বলেছিলে।

Monday, December 25, 2017

রাজনীতি

রাজনীতি হচ্ছে সরকার পরিচালনার নিমিত্তে সমাজের ভিতর থেকে উদ্ভুত বিজ্ঞান ভিত্তিক সংস্কৃতি, যার দ্বারা একটা নির্দিষ্ট সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনা করে।
রাজনীতির ইংরেজি “Politics”শব্দটি গ্রীক শব্দ “Politiká: Politika,” থেকে উৎপত্তি। যার সরল অর্থ, নগর বিষয়ক নীতিমালা বা বিষয, যার দ্বারা মানব গোষ্ঠী কর্তৃক পরিচালিত হয় রাষ্ট্র বা রাজ্য। যা সমাজের মানুষের মাঝে আন্ত সম্পর্ক সৃষ্টি করে ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে।

রাজনীতির প্রকার সমূহ
১। ডান রাজনীতি
(ক) সাম্রাজ্যবাদ রাজনীতি(খ) পুঁজিবাদ রাজনীতি
(গ) একনায়কতন্ত্র রাজনীতি
(ঘ) সামন্তবাদ রাজনীতি

২। বাম রাজনীতি
(ক) শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতি
(খ) নিপীড়িত মানুষের রাজনীতি
(গ) মৌলবাদ বিরোধী রাজনীতি
(ঘ) সাম্যবাদের রাজনীতি
৩। ধর্ম রাজনীতি
ধর্ম রাজনীতি ভেঙ্গে দেখাতে গেলে আমার চোদ্দো গুষ্টি ঊদ্ধার হবে। তো ইহা জানিতে চাহিয়া আমায় হাসাইবেন না প্লিজ।

কারা রাজনীতি করে?
যারা রাজার নীতি নিয়ে প্রশ্ন করে, আলোচনা করে, সমালোচনা করে তারা সকলেই রাজনীতি করে। কেউ পরোক্ষ ভাবে করে আর কেউ প্রতোক্ষ ভাবে করে। যেমন আপনি প্রশ্ন করেছেন আপনি রাজনীতি করেন সেটা প্রতোক্ষ না হয়ে পরোক্ষ হতে পারে। আবার আমরা যারা আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি তারাও রাজনীতি করে। আমরা রাজনীতি না করলে আপনার প্রশ্নের উত্তর লিখছি কেন। যেহেতু রাজনীতি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করি, তার মানে আমরা সকলেই রাজনীতি করি। শিশু ও অতিশয় বৃদ্ধ ছাড়া।
                                                                                                                                                 
ভালো রাজনীতি কখনো বিরক্তি এবং বিড়ম্বনার বিষয় নয়। তাই যদি না হতো তাহলে আমরা লাখ মানুষের রক্ত আর মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীনতা লাভ করতে পারতাম কি। যারা আপন স্বার্থ, আশা আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়ে জনকল্যাণার্থে রাজনীতি করেছেন বা এখনও যারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের দ্বারা এখন আর রাজনীতি সেই অর্থে পরিচালিত হয় না। তাই যারা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নানা অবৈধ কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে রাজনীতিকে বিষময় করে চলেছে তাদের সকলের গলা এই মুহূর্তে টিপে ধরার সময় বলে আমি মনে করি।
কিছু অরাজনৈতিক নেতার কারণে রাজনীতি আর রাজনীতি নেই। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকেও কেউ কেউ রাজাকার বলার সাহস দেখায়। রাজনীতি সঠিক পথে চললে এইসব ব্যক্তি রাজনীতি করার সুযোগ পেত না। রাজনীতি প্রকৃত রাজনীতিকদের হাতে থাকা উচিত।
দেশের রাজনীতিতে এখন কালো মেঘের ছায়া পড়েছে। দেশের উন্নয়নে রাজনীতিকদের সহনশীল হওয়া জরুরি।  যেকোনো দেশের উন্নয়নে সরকারি ও বিরোধী দলের প্রয়োজন রয়েছে। অথচ সেই রাজনীতিতে যদি অস্থিরতা, সহিংসতা ইত্যাদি দেখা দেয় তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সেই রাজনীতি হয় অকল্যাণকর ও অপ্রয়োজনীয়।
রাজনীতি এখন আর সাধারণ মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে না। রাজনীতি এখন অন্যরকম হয়ে গেছে, যেখানে ব্যক্তি স্বার্থই প্রধান। ফলে নানা দ্বন্দ্ব আর সংঘাত। তাই সবকিছু ভুলে গিয়ে নিঃস্বার্থভাব রাজনীতিকে লালন করতে হবে।
রাজনীতি আমাদের সব দিয়েছে এ কথা সত্য। ভাষা, স্বাধীনতা ও বিজয় আমরা রাজনীতির মাধ্যমেই পেয়েছি। কিন্তু বর্তমানে রাজনীতি অপরাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। এক দল জোরপূর্বক ক্ষমতায় দখল করে আছেন আর অন্য দল জ্বালাও পোড়াওয়ের মাধ্যমে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে চলেছে।
রাজনীতি খুব ভালো বিষয়। কিন্তু এই ভালোকে যদি টিকিয়ে রাখা না যায় তা হলে রাজনীতি কখনোই মানুষের কল্যাণে আসেনা। তাই রাজনীতি সুন্দর ও স্বচ্ছ করতে হলে প্রয়োজন নিঃস্বার্থ, সত্ ও নিষ্ঠাবান নেতা।
আমরা সত্যিকার অর্থে সুস্থ রাজনীতির চর্চা চাই।গণতন্ত্রের নামে জীবনকে অস্থির ও দুর্বিষহ করে তোলার মতো চরম অগণতান্ত্রিক আচার আচরণের অবসান চাই। আমাদের দেশে রাজনীতির রয়েছে ঐতিহাসিক প্রাক্ষাপট। কিন্তু এখনকার রাজনীতি অসহনীয় ও বিড়ম্বনার কারণ। যা মানুষ পছন্দ করেন না।
শরিফুল হাসান সমাপ্ত

Sunday, April 16, 2017

গণতন্ত্রের নামে এসো এক হই

শরিফুল হাসান সমাপ্ত
মোবাইলঃ 01706368299
www.sharifulhasan420@gmail.com

গণতন্ত্রের নামে এসো আমরা এক হই

"আমি দুঃখিত, কিন্তু আমি একজন সম্রাট হতে চাই না যে আমার ব্যবসা নয়.আমি কাউকে শাসন করতে বা কাউকে জিততে চাই না। যদি সম্ভব হয় তবে আমি প্রত্যেককে সাহায্য করতে চাই - ইহুদি, পরজাতীয় - কালো মানুষ - সাদা ।

আমরা সবাই একে অপরের সাহায্য করতে চাই। মানুষ যে মত হয় আমরা একে অপরের সুখের দ্বারা বাঁচতে চাই - একে অপরের দুঃখের দ্বারা নয় আমরা ঘৃণা এবং একে অপরকে ঘৃণা করতে চাই না এই পৃথিবীতে সবাই জন্য ঘর আছে এবং ভাল পৃথিবী সমৃদ্ধ এবং প্রত্যেকের জন্য প্রদান করতে পারেন

জীবন পথ মুক্ত এবং সুন্দর হতে পারে, কিন্তু আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। লোভ মানুষের আত্মা জিহ্বা করেছে - বিশ্বের ঘৃণা সঙ্গে বাধা - হিংস - দুর্দশা এবং রক্তপাতের মধ্যে আমাদের পদত্যাগ। আমরা গতি বিকাশ করেছি, কিন্তু আমরা নিজেদেরকে বন্ধ করে দিয়েছি। প্রচুর পরিমাণে যন্ত্রপাতি দিয়ে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের জ্ঞান আমাদের নিন্দা করেছে; আমাদের চ্যালেঞ্জ, কঠিন এবং নির্দয়। আমরা খুব বেশি চিন্তা করি এবং খুব সামান্য মনে করি। যন্ত্রপাতি বেশী আমরা মানবতার প্রয়োজন। আরো চালাকি চেয়ে, আমরা আপনাকে অনুগ্রহশীল ব্যক্তিদের এবং নম্রতা প্রয়োজন। এই গুণ ছাড়া, জীবন
হিংস্র হবে এবং সব হারিয়ে যাবে।

বিমান এবং রেডিও আমাদের প্রায় একসঙ্গে নিয়ে এসেছে। এই আবিষ্কারের প্রকৃতিটি মানুষের ধার্মিকতার জন্য ক্রন্দন করে - সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বের জন্য চিৎকার করে - আমাদের সকলের ঐক্যের জন্য। এমনকি এখন পর্যন্ত আমার ভয়েস সারা পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছেছে - লক্ষ লক্ষ হতাশ পুরুষ, নারী ও ছোট শিশু - এমন একটি সিস্টেমের শিকার যা মানুষকে নির্যাতন ও নির্দোষ মানুষকে বন্দি করে তোলে। যারা আমার কথা শুনতে পায়, আমি বলি, 'হতাশা করো না।' আমাদের উপর যে দুর্ভাগ্য এখন তা হল লোভের ক্ষুধা - মানুষের অগ্রগতির উপায়কে ভয় করে এমন মানুষের তিক্ততা। মানুষ ঘৃণা করবে, এবং একনায়ক মারা যাবে, এবং ক্ষমতা
তারা মানুষ থেকে ফিরে মানুষ ফিরে হবে। এবং যতদিন মানুষ মারা যায়, ততদিন স্বাধীনতা কখনোই বিনষ্ট হবে না।

কমরেডস, নিজেকে বিড়ালদের হাতে ছেড়ে দিন- যারা আপনাকে তুচ্ছ করে এবং আপনাকে ক্রীতদাস করে তোলে - যারা আপনার জীবন রঞ্জিত করে - আপনাকে কি করতে হবে তা বলুন - কি ভাবছেন এবং কি ভাবছেন! আপনি কেঁচো - আপনি খাদ্য - আপনি গবাদি পশু মত আচরণ, ক্যানন চড় হিসাবে হিসাবে আপনি ব্যবহার। মেশিনের মন এবং মেশিন হৃদয় দিয়ে মেশিন পুরুষদের - এই অস্বাভাবিক পুরুষদের নিজেকে দিতে না! আপনি মেশিন নয়! আপনি গবাদি পশু না! আপনি মানুষ! আপনার হৃদয়ে মানবতার ভালবাসা আছে। আপনি ঘৃণা করবেন না, শুধুমাত্র অপছন্দ ঘৃণা - অপছন্দ এবং অপ্রাকৃত!

কমরেডস, দাসত্বের জন্য লড়াই করবেন না! স্বাধীনতা যুদ্ধ! সেন্ট লূকের ১৭ তম অধ্যায়টিতে, ঈশ্বরের রাজ্যে মানুষের মধ্যে এক পুরুষ বা পুরুষের একটি দল নয়, কিন্তু সমস্ত মানুষের মধ্যে লেখা হয়! তোমার মধ্যে! আপনি, মানুষ, ক্ষমতা আছে - মেশিন তৈরি করার ক্ষমতা। সুখ সৃষ্টি করার ক্ষমতা! আপনি, মানুষ, এই জীবন বিনামূল্যে এবং সুন্দর করতে ক্ষমতা আছে - এই জীবন একটি বিস্ময়কর দু: সাহসিক কাজ করা। তারপর গণতন্ত্রের নামে - আসুন আমরা সেই ক্ষমতা ব্যবহার করি - আমাদের সকলকে একত্রিত করা যাক। আসুন আমরা একটি নতুন জগতের জন্য লড়াই করি - একটি ভালো বিশ্ব যা পুরুষদেরকে কাজ করার সুযোগ দেবে - যা ভবিষ্যৎ ও যুবককে একটি নিরাপত্তা দেবে।

এই জিনিস প্রতিশ্রুতি দ্বারা, নরপশু ক্ষমতা থেকে বেড়ে গেছে। কিন্তু তারা মিথ্যা! তারা যে প্রতিশ্রুতি পূর্ণ না তারা করবে না! নির্দোষরা নিজেদের মুক্ত করে কিন্তু তারা জনগণকে দাস বানায়। এখন আমাদের এই প্রতিশ্রুতি পূরণে লড়াই করতে দাও! আসুন আমরা দুনিয়া মুক্ত করতে লড়াই করি - জাতীয় বাধাগুলি দূর করতে - লোভ থেকে দূরে থাকা, ঘৃণা এবং অসহিষ্ণুতা দিয়ে। আসুন আমরা বিশ্বের জগতের জন্য লড়াই করি - একটি বিশ্ব যেখানে বিজ্ঞান ও অগ্রগতি সকল পুরুষের সুখের দিকে পরিচালিত হবে। গণতন্ত্রের নামে সাঁওতালরা, আমাদের একত্রিত হোক!

কমরেডস, তুমি কি আমাকে শুনতে পাও? আপনি যেখানেই থাকুন, কমরেডস উপর দিকে তাকান মেঘ উঠছে! সূর্য ভঙ্গ করে! আমরা অন্ধকার থেকে আলোর মধ্যে আসছি আমরা একটি নতুন জগতে আসছি - একটি সদৃশ জগৎ, যেখানে মানুষ তাদের ঘৃণা, তাদের লোভ এবং তাদের নির্মমতা উপরে উঠবে। দেখ, কমরেডস মানুষের আত্মা উইংস দেওয়া হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি উড়তে শুরু করবে। তিনি আকাশচুম্বী আকাশে উড়ছেন - আশার আলোকে, ভবিষ্যতে, আপনার জন্য যে গৌরবময় ভবিষ্যৎ, আমার কাছে এবং আমাদের সকলকে। দেখ, কমরেডস ... দেখ! "

কমরেডস

গণতন্ত্রের নামে “এসো আমরা একত্র হই”

Saturday, February 18, 2017

স্বাধীনতার বীজ বুনা ছিল যেখানে

এই পৃথিবীর প্রতিটি জাতিতার ভাষা দ্বারা অনুপ্রানীত। কিন্তু খুব কম সংখ্যক জাতিই তার ভাষা থেকে জন্মেছে। বাংলাদেশের বাঙ্গালীরা তার মধ্যে অন্যতম।
আপনি কি জানেন একবার একটি ভাষা ও গুলির মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল? আপনি কি জানেন কোন পক্ষ জিতেছিল? একটু ভাবুন!!!!
এই লড়াইটা শুরু ১৯৪৭ ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই। তখন বাংলাদেশর নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান।

 শরিফুল হাসান সমাপ্ত 


প্রথম পর্যায়
১৫ ই সেপ্টেমবর, ১৯৪৭:  ইসলামি আদর্শে অনুপ্রাণিত লেখক, সাংবাদিক ও বিদ্দজ্জনদের সংগঠন তামুদ্দুন মজলিস বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করার দাবী করে। নভেম্বর, ১৯৪৭: করাচিতে বাঙ্গালি শিক্ষা মন্ত্রী ফজলুর রহমানের ডাকা পাকিস্তান এডুকেশনাল কনফেরেন্সে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধিরা উর্দূকে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা হিসেব গণ্য করার বিরোধিতা করলেন।
২৩ শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৪৮: পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নকালে ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত উর্দূ ও ইংরাজির সঙ্গে বাংলাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার জন্য প্রস্তাব আনেন কিন্তু অন্যান্য অবাঙ্গালিরা প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেন। বাঙ্গালি আমলা, শিক্ষাবিদ, ছাত্র এবং মধ্যবিত্তদের অন্যান্য অংশের সমর্থনপুষ্ট হয়ে বাংলাকে অন্যতম জাতীয় ভাষা করার দাবী শক্তিশালী হয়ে ঊঠল, আর ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই বিতর্ক রাস্তায় নেমে আসে।
মার্চ, ১৯৪৮: প্রথম সপ্তাহে বাম, দক্ষিন ও মধ্য পন্থী--ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব রাজনৈতিক মতাবলম্বী ছাত্ররা মিলে বাংলা ভাষাকে জাতীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে একটি কমিটি গঠন করলেন।
মার্চ ২১, ১৯৪৮: পাকিস্তানের স্রষ্টা এবং প্রথম গভর্নর জেনারেল মহম্মদ আলি জিন্না পূর্ব বাংলা সফরকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেন, "বাংলাকে প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে, কিন্তু উর্দূ ছাড়া অন্য কোন ভাষা রাষ্ট্র ভাষা হতে পারেনা। আপনাদের যারা বিপথে চালিত করার চেষ্টা করছে, তারা পাকিস্তানের শত্রু।"
"তাঁর এই মন্তব্যে অপমানিত বোধ করা বাঙ্গালি যুব সমাজ ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানাল। যাঁরা প্রতিবাদের আওয়াজ তুলেছিলেন এবং আটক হন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন সেই সময়ে বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্র বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
দ্বিতীয় পর্যায়
জানুয়ারি ২৬, ১৯৫২: পল্টন ময়দানে একটি জন সভায় মুখ্য মন্ত্রী নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করলেন একমাত্র উর্দূই রাষ্ট্র ভাষা হতে চলেছে। এই ঘটনার পরেই পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফার ভাষা আন্দোলন শুরু হল।
জানুয়ারি ২৮, ১৯৫২: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রতিবাদ সভায় ছাত্ররা প্রধানমন্ত্রী এবং প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রীদের পশ্চিম পাকিস্তানের বোঁচকাবুঁচকি বাহক আখ্যা দিল।
জানুয়ারি ৩০, ১৯৫২: একটি গোপন বৈঠকে কম্যুনিস্ট জোট ছাড়াও অন্যান্য সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়ে সবাই এক মত হলেন যে, সার্থক ভাবে ভাষা আন্দোলন চালিয়ে যেতে হলে শুধু একা ছাত্ররাই যথেষ্ট নয়, তাই সর্ব স্তরের রাজনৈতিক এবং ছাত্র সমর্থন পেতে জননেতা মওলানা ভাসানির নেতৃত্বে আন্দোলন চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জানুয়ারি ৩১, ১৯৫২: ঢাকায় একটি সর্ব দল বৈঠকে কাজি গোলাম মাহ্‌বুবকে আহ্বায়ক করে এবং মওলানা ভাসানিকে সভাপতি করে একটি সম্প্রসারিত 'অল পার্টি কমিটি অফ অ্যাকশন ' গঠন করা হল।
ফেব্রুয়ারি ৩, ১৯৫২: পূর্ব বঙ্গ জুড়ে 'ভাষা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের' প্রতিবাদে কমিটি অফ অ্যাকশন ঢাকায় একটি প্রতিবাদ সভা ডাকে। আবুল হাশিমের পরামর্শক্রমে ঠিক হয় ২১ শে ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ ইস্ট বেঙ্গল অ্যাসেমব্লির বাজেট অধিবেশন শুরুর দিন, একটি সাধারন ধর্মঘট ডাকা হবে।
ফেব্রুয়ারি ২০, ১৯৫২: সন্ধ্যা ছ'টার সময় ঢাকা শহরে মিছিল এবং মিটিঙের উপর ১৪৪ ধারা অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা জারী হল। এই আদেশ ছাত্রদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিল।
ফেব্রুয়ারি ২১, ১৯৫২: সাধারন ধর্মঘট পালিত হল।
দুপুর--ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামপাসে একটি সভায় ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নেয় মিছিল এবং মিটিঙের উপর ১৪৪ ধারা অমান্য করার।
বিকেল ৪টা
মেডিক্যাল কলেজের হস্টেলের সামনে পুলিশ গুলি চালায়। এতে পাঁচ জন-মহম্মদ সালাউদ্দিন, আব্দুল জব্বর, আবুল বরকত, রফিকুদ্দিন আহ্‌মেদ এবং আব্দুস সালাম নিহত হন। এঁদের মধ্যে প্রথম তিন জন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
ফেব্রুয়ারি ২২, ১৯৫২: হাজার হাজার মানুষ পুলিশের গুলিতে নিহতদের জন্য প্রার্থনা করতে জড় হলেন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ এবং এঞ্জিনীয়ারিং কলেজ প্রাঙ্গণে। প্রার্থনার পর তাঁরা যখন মিছিল করে যাচ্ছেন, তখন পুলিশ আবারো গুলি চালায়। এই ঘটনায় চার জনের মৃত্যু হয়।
ফেব্রুয়ারি ২৩, ১৯৫২: একটি সম্পূর্ন ও স্বতঃস্ফুর্ত সাধারন ধর্মঘট পালিত হয়।
ফেব্রুয়ারি ২৪, ১৯৫২: ঢাকায় ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার পুলিশ আর মিলিটারিকে ঢালাও ক্ষমতা দেয়। এই ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পুলিশ ভাষা আন্দোলনের সাথে যূক্ত প্রায় সব ছাত্র এবং রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার করে। দমন পীড়নের কারনে আন্দোলন ঢাকায় কিছুটা ঝিমিয়ে যায়, কিন্তু ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে।

পরিণতি
 মে ৭, ১৯৫৪: পাকিস্তান সরকার বাংলাকে একটি জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি জানায়।
মার্চ ২৬, ১৯৭১: একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ।
ডিসেম্বর ১৬,১৯৭১: বিজয়ের লাল সবুজ পতাকা

Monday, January 9, 2017

আজ বংলাদেশের প্রতি ও পশ্চিমাদের অবস্থান দেখে একটি কবিতা মনেপড়ে গেল। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের সাথে ভারত, আমেরিকার সম্পর্ক মিলানো যায়।


আজ বংলাদেশের প্রতি ও পশ্চিমাদের অবস্থান দেখে একটি কবিতা মনেপড়ে গেল। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের সাথে ভারত, আমেরিকার সম্পর্ক মিলানো যায়।

বাকি রাখা খাজনা
মোটে ভাল কাজ না
ভরপেট নাও খাই
রাজকর দেওয়া চাই
অনাহারে নাই ক্ষেত
বেশি খেলে বাড়ে মেদ
যায় যদি যাক প্রাণ
হীরকের রাজা ভগবান

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে অনেক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও প্রটোকল সই হয়েছে। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ভারতীয় হাইকমিশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য চুক্তিগুলো হলো :
বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও শান্তিবিষয়ক চুক্তি : ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও শান্তিবিষয়ক চুক্তি সই হয়। ওই চুক্তির মেয়াদ ছিল ২৫ বছর। মেয়াদ শেষে তা আর পুনরায় নবায়ন করা হয়নি।
বাণিজ্য চুক্তি : ১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ১৯৮০, ১৯৯৮ ও ২০০৬ সালে অনুরূপ চুক্তি সই করা হয়। সর্বশেষ সই হয় ২০০৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এবং এর মেয়াদ ২০০৯ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০১২ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত।
অভ্যন্তরীণ নৌপথ অতিক্রম ও বাণিজ্য প্রটোকল : ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর এ প্রটোকলটি সই হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে প্রটোকলটি নবায়ন করা হয়েছে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের গোয়ায় দুই দেশের নৌপরিবহন সচিবরা ওই প্রটোকলের মেয়াদ ২০১২ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নবায়ন করেন।
সাংস্কৃতিক সহযোগিতা চুক্তি : ১৯৭২ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা চুক্তি সই হয়।
স্থল সীমান্ত চুক্তি : ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থল সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি নামেও পরিচিত।
বিমান পরিবহন চুক্তি : ১৯৭৮ সালের ৪ মে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিমান পরিবহন চুক্তি সই হয়।
যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন চুক্তি : ১৯৮২ সালের ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন চুক্তি সই হয়।
দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি : এটি সই হয় ১৯৯১ সালের ২৭ আগস্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি : ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তিটি সই হয়।
মোটরযান যাত্রী পরিবহন চুক্তি : ১৯৯৯ সালের ১৭ জুন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অনির্দিষ্ট মেয়াদে মোটরযান যাত্রী পরিবহন চুক্তি সই হয়।
ঢাকা-কলকাতা বাস সার্ভিস প্রটোকল : ১৯৯৯ সালের ১৭ জুন স্বাক্ষরিত প্রটোকলটি দুই বছর পরপর নবায়নযোগ্য। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ১৫ অক্টোবর এটি নবায়ন করা হয়।
বেনাপোল-পেট্রাপোল রেল ট্রাফিক পুনঃস্থাপন চুক্তি : এটি সই হয় ২০০০ সালের ৪ জুলাই। দুই বছর মেয়াদি এ চুক্তি নবায়নের কারণে বলবৎ আছে।
সংশোধিত ভ্রমণ ব্যবস্থা বিষয়ে চুক্তি : ২০০১ সালের ২৩ মে সই হয়। শুরুতে এর মেয়াদ পাঁচ বছর থাকলেও বর্তমানে তা বলবৎ রয়েছে।
যাত্রীবাহী রেল সার্ভিস চুক্তি : ২০০১ সালের ১২ জুলাই চুক্তিটি সই হয়। তিন বছর মেয়াদি এ চুক্তিটি পরে বিভিন্ন সময়ে নবায়ন করা হয়েছে এবং বর্তমানে তা বলবৎ আছে।
ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিসের ওপর প্রটোকল : ২০০১ সালের ১০ জুলাই প্রটোকলটি স্বাক্ষরের পর নবায়নের কারণে বর্তমানেও বলবৎ।
সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির জন্য সাধারণ ও অর্থসংক্রান্ত বিধিবিধান : ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির জন্য সাধারণ ও অর্থসংক্রান্ত বিধিবিধান সই করা হয় ২০০৫ সালের ৬ আগস্ট।
মাদকদ্রব্য ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের অবৈধ পাচার রোধ চুক্তি : এটি সই হয় ২০০৬ সালের ২১ মার্চ অনির্দিষ্টকালের জন্য।
বিএসটিআই ও বিআইএসের মধ্যে সমঝোতা স্মারক : ২০০৭ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ও ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডসের (বিআইএস) মধ্যে অনির্দিষ্ট মেয়াদি সমঝোতা স্মারক সই করা হয়।
বেসামরিক বিমান পরিবহনবিষয়ক সমঝোতা স্মারক : এটি সই হয় ২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। মেয়াদ অনির্দিষ্ট।
দ্বিপক্ষীয় পুঁজি বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও সংরক্ষণ চুক্তি : ১০ বছর মেয়াদি এ চুক্তি সই হয় ২০০৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি।
অপরাধ বিষয়ে পরস্পরকে আইনি সহায়তা প্রদানের চুক্তি : ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়া দিলি্ল সফরের সময় এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
সাজাপ্রাপ্ত বন্দিবিনিময় চুক্তি : ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের সময় সাক্ষর করা হয়।
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, সংঘটিত অপরাধ এবং অবৈধ মাদক পাচার মোকাবিলার চুক্তি : ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত হয়।
বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক : ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি স্মারক সই করা হয়।
সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি : ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি সই হয়।
১০০ কোটি ডলার ঋণচুক্তি : ২০১০ সালের ৭ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশ সরকার ও ভারতের এক্সিম ব্যাংকের মধ্যে ১০০ কোটি ডলারের (প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা) ঋণচুক্তি সই করা হয়।
সীমান্ত হাট চুক্তি : ২০১০ সালের ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত হাট চুক্তি ও দুই দেশের ট্রাক চলাচল বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) স্বাক্ষরিত হয়।
ভারতীয় কোম্পানির সাথে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ চুক্তি ১৩ জুলাই ২০১৬, বুধবার,
বহুল আলোচিত রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ চুক্তি সই হয়েছে।

আমেরিকা


২৬ নভেম্বর ২০১৩ সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত সোয়া ৯টায় ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুল আলোচিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তি (টিকফা) সই করেছে বাংলাদেশ।

Monday, January 2, 2017

বাংলাদেশের বাজার ধ্বংসকারী চুক্তি টিফা বা টিকফা।

টিফা’ বা ‘টিকফা স্বাক্ষরিত হল। খুব তড়িঘড়ি করে এমন সময় চুক্তিটি সাক্ষর করা হোল যখন শাসক দল নির্বাচন কালীন সর্বদলীয় সরকার গঠন করেছে বলে দাবী করেছে এবং শুধুমাত্র নির্বাচন উপলক্ষে করনীয় জরুরী কাজগুলো সম্পাদন করবে বলে প্রচার করছে। টিকফা ১৯৮৬ সালে এরশাদ আমলে অ্যামেরিকার সাথে স্বাক্ষরিত বাই ল্যাটারাল ইনভেস্টমেন্ট ট্রিটির একটি বর্ধিত রূপ। উল্লেখ্য টিকফাতেও সেই চুক্তির ধারা সমুহ কঠোর ভাবে পালনের বাধ্যবাধকতা যুক্ত হয়েছে।
টিকফা কী?
টিকফা শব্দটি নতুন। আগে এর নাম ছিল টিফা।‘টিফা’ চুক্তি হল Trade and Investment Framework Agreements বা সংক্ষেপে TIFA, যেটিকে বাংলায় অনুবাদ করলে হয় ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত কাঠামোগত সমঝোতা’ চুক্তি। ‘টিফা’ চুক্তি নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে গত বারো বছর আগে থেকে। এই চুক্তির খসড়া প্রণয়নের কাজ শুরু হয় ২০০১ সালে। ১৩টি ধারা ও ৯টি প্রস্তাবনা সম্বলিত চুক্তিটির প্রথম খসড়া রচিত হয় ২০০২ সালে। পরে ২০০৪ সালে এবং তারও পরে আবার ২০০৫ সালে খসড়াটিকে সংশোধিত রূপ দেয়া হয়। দেশের বামপন্থি শক্তিসহ অন্যান্য নানা মহলের তীব্র প্রতিবাদের মুখে চুক্তিটি স্বাক্ষর করা এতদিন বন্ধ ছিল। চুক্তির খসড়া প্রণয়নের পর সে সম্পর্কে নানা মহল থেকে উত্থাপিত সমালোচনাগুলো সামাল দেয়ার প্রয়াসের অংশ হিসেবে এর নামকরণের সাথে Co-operation বা সহযোগিতা শব্দটি যোগ করে এটিকে এখন ‘টিকফা’ তথা TICFA বা Trade and Investment Co-operamework Agreement (‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সংক্রান্ত কাঠামোগত সমঝোতা’ চুক্তি) হিসাবে আখ্যায়িত করার হচ্ছে।

চুক্তিটি কেন?
আমেরিকার ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পলিসি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মার্কিন কর্তৃপক্ষ স্বীকার করছে তাঁদের বাণিজ্যে শ্রেষ্ঠত্ব ঝুঁকির মুখোমুখি। ২০০০-২০১১ পর্যন্ত আমেরিকার রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি অন্যান্য অগ্রসর অর্থনীতির তুলনায় থমকে গেছে। ২০০২ সাল থেকেই আমেরিকার রপ্তানি আয় কে ছারিয়ে গেছে জার্মানি। রপ্তানি ভিত্তিক ট্রেডে গড় আয় বেশী, অ্যামেরিকান চাকুরির মাত্র ৭% রপ্তানি ভিত্তিক ট্রেডে ১৯৯৯ সাল থেকে এই হার আর বাড়েনি, অথচ সারা বিশ্বে অর্থনীতিতে এই সময়টাতেই বিপুল স্ফীতি ঘটেছে। অ্যামেরিকান আভ্যন্তরীণ চাকরির বাজার মুলত নন ট্রেড এবং সরকারী সেক্টরে। এই খাতগুলো ক্রমান্বয়ে ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্য হওয়ায় অ্যামেরিকান দের ট্রেড সেক্টরে ব্যাপক সাফল্যের মাধ্যমে নাগরিকদের আয় বৃদ্ধিই অ্যামেরিকান বাণিজ্য নীতির মুল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১০ সালে সিনেট অব দ্যা ইউনিয়ন স্পিচ এ আগামী পাঁচ বছরে রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেন, তিনি আরো আক্রমণাত্মক ভাবে বাজার তৈরি করতে হবে যেন আমাদের মাটিতে আরো নতুন চাকরি তৈরি হয় আর নিশ্চিত করতে হবে আমাদের ট্রেডিং পার্টনাররা “প্লে বাই দ্যা রুলস”। কার রুলস? এই রুলস হচ্ছে আমেরিকার তৈরি রুলস। আর এই রুলস হচ্ছে টিকফা।

চুক্তিটি কার জন্য?
চুক্তিটি আমেরিকার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের। এই চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্র করেছে অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গেও। চুক্তিটির ধারা উপধারা ও আমেরিকার তৈরি। আমেরিকা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে নাছোড়বান্দা ছিল এবং তারা হাল ছেড়ে না দিয়ে বছরের পর বছর ধরে এজন্য সে বাংলাদেশের ওপর ক্রমাগত চাপ দিয়ে চলেছে। এর মাঝে এদেশে ও আমেরিকায় কয়েক দফা সরকার বদল হয়েছে। কিন্তু ‘টিফা’ চুক্তির বিষয়টি সব আমলেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হয়ে থেকেছে। তারা এমনও বলেছে যে,‘টিফা’ চুক্তি স্বাক্ষর না করলে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পরবে। যেহেতু বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য ও আধিপত্য প্রশ্নাতীত এবং এই অসামঞ্জস্য পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই,তাই ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগের’ স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে করা চুক্তিটির দ্বারা প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণের একতরফা সুবিধা প্রাপ্তির ব্যবস্থা করা হবে এই সমালোচনা নিরসনের জন্য ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ’-এর সাথে ‘সহযোগিতা’ শব্দ যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু চুক্তিতে যে সব প্রস্তাবনা ও ধারা রয়েছে সেগুলোর জন্য চুক্তিটি অসম ও মার্কিন স্বার্থবাহী। উল্লেখ্য আমেরিকাও তাঁদের আভ্যন্তরীণ ডকুমেন্টে অস্বীকার করেনা যে এই চুক্তি তাঁদেরকেই উপকৃত করবে।

কোথায় কোথায় বাণিজ্যে আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব আছে?
সেই বক্তৃতায়, বারাক ওবামা স্পষ্টভাবে বলেছেন এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমেরিকার স্বার্থবাহী উন্নত তৈরি পণ্য, কৃষি ও সার্ভিস সেক্টরে দৃঢ়, সুনির্দিষ্ট ট্রেড ও ইনভেস্টমেন্ট পলিসি কার্যকর করতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে উন্নত তৈরি পণ্য, কৃষি বীজ, সার, কীটনাশক এবং সার্ভিস সেক্টর মানে যোগাযোগ, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্য, পর্যটন, খনিজ, জুয়া, ব্যাংকিং, ইন্সুরেন্স, এফ এম সি জি ইত্যাদিতে মার্কিনিরা একক আধিপত্য তৈরি করবে। এবং এই সেক্টর গুলো থেকে মুনাফা স্থানান্তর করে অ্যামেরিকায় চাকুরি বৃদ্ধি করবে। এর সরাসরি ফলাফলে সার্ভিস সেক্টরে জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ বাধাগ্রস্থ এবং পরিশেষে বন্ধ হয়ে যাবে।

টিকফা দিয়ে কীভাবে বাণিজ্যে মার্কিন স্বার্থ রক্ষিত হবে?
অ্যামেরিকান ট্রেড পলিসির লক্ষ্য হিসেবে ঘোষিত পদক্ষেপগুলোই টিকফার মুল বিষয়। অ্যামেরিকান ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে, ১/ শুল্ক বাধা দূর করা, ২/ বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ৩/ সরকারী ভর্তুকি বন্ধ করা ৪/ সরকারী ক্রয়ে অংশ নেয়া ৫/ পরিবেশ ও শ্রমের পরিবেশ উন্নত করা ৬/ মেধাসত্ত্ব কড়াকড়ি ভাবে আরোপ করা।
টিকফা’ চুক্তির খসড়ায় পণ্য ও পুঁজির চলাচলকে অবাধ করার কথা এবং সেই সূত্রে মুনাফার শর্তহীন স্থানাস্তরের গ্যারান্টির কথা বলা হলেও শ্রম শক্তির অবাধ যাতায়াতের সুযোগের কথা কিছুই বলা হয়নি। অথচ শ্রম শক্তিই হলো আমাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মূল্যবান সম্পদ যার রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে বিপুল আপেক্ষিক সুবিধা। কিন্তু সে ক্ষেত্রে ‘খোলাবাজার’ নীতিটি যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োগ করতে রাজি নয়। তারা তা প্রয়োগ করতে প্রস্তুত কেবল পুঁজি এবং পণ্য-সেবা পণ্যের ক্ষেত্রে, যে ক্ষেত্রে তার রয়েছে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি আপেক্ষিক সুবিধা। অন্যদিকে, টিকফাতে ‘শুল্ক বহির্ভূত বাধা’ দূর করার শর্ত চাপানো হলেও ‘শুল্ক বাধা’ দূর করার কথা বেমালুম এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত তৈরি পোশাক শিল্পের পণ্যের ক্ষেত্রে, গড় আন্তর্জাতিক শুল্ক যেখানে ১২%, যুক্তরাষ্ট্রের তা ১৯%।
বিনিয়োগের সুরক্ষার নামে মুনাফার শুল্ক বিহিন স্থানান্তর, দেশীয় বিনিয়োগকারীর সম সুযোগ, বিনিয়োগ ক্ষতি গ্রস্থ হলে ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারী ক্রয় নীতিতে দেশীয় পণ্য ও দেশীয় উৎপাদক এতদিন যে প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকার পেতেন সেটা সমভাবে পাবে অ্যামেরিকান পণ্য ও উৎপাদকরা। বিশেষ করে কৃষিতে ভর্তুকি প্রত্যাহার করার চাপ সৃষ্টি করে টিকফা চুক্তির মাধ্যমে কৃষিতে জনবান্ধব রাষ্ট্র নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে।
দোহায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলনে গৃহীত ‘দোহা ডেভেলপমেন্ট এজেন্ডার’ মূল বিষয়গুলোও ছিলঅ-কৃষিপণ্যের বাজার উন্মুক্তকরণ, কৃষি থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার, মেধাজাত সম্পত্তি অধিকার (ট্রিপস) এবং সার্ভিস বা পরিবেশ খাতে বিনিয়োগ উদারিকরণ ইত্যাদি। কিন্তু এসব বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের স্বার্থ অভিন্ন নয়। বরং এসব ক্ষেত্রে মার্কিনের স্বার্থের সাথে বাংলাদেশের স্বার্থের গুরুতর বিরোধ আছে।

টিকফার বর্ণিত এই সুযোগ গুলো কি আমরাও নিতে পারবো?
কথাটা ঠিক নয়। বাণিজ্যে বাংলাদেশ আর মার্কিনীদের সক্ষমতা সমপর্যায়ের নয়। টিকফাতে সুচতুর ভাবে শ্রমের মান এবং ও পরিবেশ উন্নত করার ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ধারা গুলোর লক্ষ্য কিন্তু কোনভাবেই শ্রমজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নয় বরং এগুলোকে নন- ট্যারিফ (অশুল্ক) বাধা হিসেবে ব্যাবহার করে যুক্তরাষ্ট্র তার বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের রফতানি নিয়ন্ত্রণ করবে। এছাড়াও আছে মেধাসত্ত বাঁধা। অধিকাংশ পণ্য ও সেবার মেধাসত্ত মার্কিনীদের অথবা মার্কিনী প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকার কারণে যে দেশী শিল্পের কোন বিক্রি এবং মুনাফার একটা বড় অংশ আবার ঘুরে ফিরে মার্কিনীদের হাতেই ফিরে যাবে। মেধাসত্তর কড়াকড়ি স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ার কারণে আমাদের মত দেশের জন্য ২০২১ সাল পর্যন্ত শিথিল করা থাকলেও এই টিকফার কারণে তা এখন থেকেই কড়াকড়ি ভাবে মানার বাধ্যবাধকতা তৈরি হোল।

এতো বহুপক্ষিয় বাণিজ্য চুক্তি থাকতে টিকফা চুক্তি করার প্রয়োজন পড়লো কেন?
টিকফা একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। বিশ্ব বাণিজ্যের যে সমস্ত বহুপক্ষিয় প্রতিষ্ঠান এবং চুক্তি সমুহ আছে বা ছিল যেমন ডব্লিউ টি ও; জি এ টি টি, নাফটা, উরুগুয়ে রাউন্ড, টোকিয়ো রাউন্ড সেগুলোর সবচেয়ে বেশী লাভ ঘরে তুলেছিল আমেরিকা। এবং বিশ্ব বাণিজ্যে অ্যামেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব তিরিশ বছর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। কিন্তু ২০০১ সালে ডব্লিউ টি ও তে চিনের অন্তর্ভুক্তি সব উলটে পাল্টে দেয়। এর পর থেকেই মার্কিন বাণিজ্য ক্ষেত্র গুলি একে একে চিনের দখলে চলে যেতে থাকে। ২০০৩ সালে প্রথম অ্যামেরিকার রপ্তানি আয় কে জার্মানি ছাড়িয়ে যায়। এর মুল কারণ ছিল চিনের কাছে অ্যামেরিকার বাজার হারানো। তখন থেকেই বহুপক্ষিয় চুক্তির বিপরীতে অ্যামেরিকা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে নিজের স্বার্থ রক্ষার পথ বেছে নেয়। অ্যামেরিকার সরকারী নথিতে টিকফা সম্পর্কে স্পষ্টভাবেই উল্লেখ আছে, “Trade policy can be an innovative tool to help grow America's economy and the world economy, while helping workers and firms here at home” তাঁরা সততার সাথে ঘোষণা করেছে নিজের অর্থনীতির বিকাশের জন্যই তাঁরা এই চুক্তিটি করছে।

ট্রেড এগ্রিমেন্ট এ নন ট্রেড এলিমেন্ট কেন?
গ্লোবাল ট্রেড ওয়াচের পরিচালক লরি অয়ালচ ট্রেড এগ্রিমেন্ট গুলো পর্যালোচনা করে বলেছেন এইসব ট্রেড এগ্রিমেন্টে নন- ট্রেড এলিমেন্ট গুলোই বেশী। যেমন, প্যাটেন্ট, বৈদেশিক বিনিয়োগ সুরক্ষা, সরকারী নীতি পরিবর্তন। এই একই ঘটনাগুলো ঘটেছে টিকফার ক্ষেত্রে। তিনি আরো বলেছেন, এই সমস্ত চুক্তির লক্ষ্য থাকে বড় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোকে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর বিপরীতে অধিকতর সুবিধা দেওয়া। এর ফলে ধনী দেশগুলোই লাভবান হয় আর দরিদ্ররা আর ক্ষতি গ্রস্থ হয়। আর দরিদ্র মানে দরিদ্র দেশের দরিদ্র জনগন নয়, বরং ধনী দেশের দরিদ্র জনগণও সমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

মেধাসত্ত্ব বা পেটেন্ট আইন মানতে হলে সমস্যা কী?
পেটেন্ট কোন প্রতিষ্ঠানকে মেধাসত্ত্ব দিয়ে দেয়। ফলে সে সেই মেধাসত্ত্বের ভিত্তিতে সেই পেটেন্টের সাথে সম্পর্কিত যে কোন বাণিজ্যে
সে রয়্যালটি দাবী করতে পারে। যেমন নিমের পেটেন্ট করা আছে আমেরিকার তাই নিম গাছ থেকে উৎপাদিত যে কোন পণ্যে সে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়্যালটি দাবী করতে পারবে। বীজ এবং কৃষি পণ্যের দাম অনেকগুন বেড়ে যাবে বলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তৈরি পোশাক শিল্পকেও ব্র্যান্ড নামে ব্যবহূত এদেশের তৈরি এ্যাকসেসরিজের জন্য সংশ্লিষ্ট মার্কিন কোম্পানিকে রয়্যালটি দিতে হবে। বাসমতি চাল,চিরতার রস,নিমের দাঁতন ইত্যাদি হেন বস্তু নেই যা আগেভাগেই মার্কিনীসহ বিদেশি কোম্পানিরা পেটেন্ট করে রাখেনি। মেধাস্বত্ব অধিকারের ধারা প্রয়োগ করে তারা এসবকিছুর জন্য রয়্যালটি প্রদানে বাংলাদেশকে ‘টিকফা’ চুক্তি মাধ্যমে বাধ্য করবে। একবার নাইজেরিয়ায় একটা প্যারাসিটামল ট্যাবলেট কিনেছিলাম যেটা অ্যামেরিকান প্যাটেন্ট করা, সেই প্যারাসিটামল ট্যাবলেটের দাম যেখানে বাংলাদেশে এক টাকার কম সেটা নাইজেরিয়ায় বাংলাদেশী মুদ্রায় ২৭ টাকা লেগেছিল। এই অতিরিক্ত ২৬ টাকা প্যাটেন্ট বা মেধাসত্ত্বের মূল্য। মেধাসত্ত্বের মূল্য সবসময় মুল পণ্যটির চাইতে কয়েকগুন হয়ে থাকে।

বাণিজ্য ছাড়া টিকফা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আর কোন কোন লক্ষ্য অর্জিত হবে?
বাংলাদেশে অ্যামেরিকা দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদেশী বিনিয়োগকারী। তাঁদের মুল বিনিয়োগ জাতীয়ভাবে এবং পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল এলাকাতে। যেমন জ্বালানী সেক্টর। এই সেক্টরে প্রাধান্য রাখতে হলে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও রাখতে হয়। এই অঞ্চলে মার্কিনীদের মুল বাণিজ্যিক প্রতিপক্ষ চীনের প্রভাব এবং অগ্রগতি ঠেকাতে হলে বাংলাদেশের জমির চাইতে উন্নত শন আর নেই। বাংলাদেশকে মার্কিনীদের বাণিজ্যিক এবং সামরিক প্রভাব বলয়ের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলাটা অ্যামেরিকার জন্য সবচেয়ে লাভজনক।
এছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে মার্কিনের পক্ষে এবং স্বল্পোন্নত দেশের বিপক্ষে বাংলাদেশকে দাঁড় করানোর সুযোগ পাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিপাক্ষিক চুক্তিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে অবস্থান নিতে বাধ্য করতে পারবে। বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশগুলো তাদের অভিন্ন ও সাধারণ স্বার্থ সংরক্ষণে সম্মিলিতভাবে আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক নানা ফোরামে অবস্থান নিতে পারে। কিন্তু টিফার মতো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির কারণে বাংলাদেশ তা স্বাধীন মতো করতে পারবে না। শুধু তাই নয় বহুপক্ষীয়ভাবে যে কোনো বিরোধ নিরসনের সুযোগ হারাবে বাংলাদেশ। ‘টিকফা’ চুক্তির কারণে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আন্তর্জাতিক পরিসরে বহুপাক্ষিকভাবে প্রচেষ্টা চালাবার সুযোগ নিরঙ্কুশভাবে পাবে না। উপরন্তু বাণিজ্য সমস্যা বহুপক্ষীয়ভাবে সমাধানের বদলে তা মার্কিনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানের ফাঁদে পড়বে বাংলাদেশ। একপক্ষ প্রবল শক্তিশালী হলে দ্বিপাক্ষিক সমস্যার সমাধান স্বাভাবিক কারণেই দুর্বলের নয় বরং সবলের পক্ষেই যায়। সে কারণে বাংলাদেশকে সব সময়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে।

আর কোন কোন দেশের সাথে টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে?
মুলত মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার দরিদ্র ও সংঘাত ময় দেশগুলো, আসিয়ান দেশগুলো, সাবেক সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলো, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, আফগানিস্তান।

জি এস পি সুবিধার পাবার প্রশ্নের সাথে কি টিকফা চুক্তি যুক্ত?
টিকফার সাথে জি এস পি সুবিধার কোন সম্পর্ক নেই। দোহা নীতি অনুসারে আমেরিকা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ৯৭% পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়ার কথা যেটাকে সাধারণভাবে জি এস পি সুবিধা বলা হয়। উল্লেখ্য বাংলাদেশের জন্য সমস্ত জি এস পি সুবিধা আপাতত স্থগিত আছে। আমেরিকা ঠিকই বাংলাদেশের ৯৭% পণ্যের ক্ষেত্রে এই সুবিধা দিয়েছিল তবে তাতে ঐসব পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো যার রপ্তানির পরিমান খুবই কম এবং বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা সামান্য। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাককে সবসময়েই এর বাইরে রাখা হয়েছে। যেই সব পণ্য জি এস পি সুবিধার আওতায় ছিল সেই সব পণ্যের জন্য জি এস পি সুবিধা থাকা আর না সমান কথা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের যে গার্মেন্টস পণ্য রফতানি হয় তার ওপর উচ্চহারে শুল্ক বসিয়ে রেখেছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের গড় আমদানি শুল্ক হার শতকরা ১ ভাগের মতো। কিন্তু বাংলাদেশের গার্মেন্টসের ওপর শুল্কহার শতকরা গড়ে ১৫ ভাগ। এই শুল্কহার আন্তর্জাতিক বিধিরও পরিপন্থী। এই শুল্ক এমনিতেই বাতিল হওয়া দরকার। এবছরও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্কবাবদ প্রদান করেছে প্রায় ৫৬০০ কোটি টাকা। এটা যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে ঋণ অনুদান নানাভাবে বাংলাদেশে আসে আসে তার ৬ গুণেরও বেশি। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে নয়,বাংলাদেশই যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থের যোগান দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এত আগ্রহ কেন?
বাংলাদেশের মতো ছোট একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সাধারণ একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে কিনা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ, তার এত মাথাব্যথা কেন? এ প্রশ্ন টিফা-টিকফা নিয়ে সবসময় ছিল। এবারও উঠেছে। টিকফা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগ ও শর্তারোপই প্রমাণ করে চুক্তিটি করার জন্য তারা কতটা মরিয়া। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর আছে টিকফা চুক্তির মধ্যেই। বাণিজ্যমন্ত্রী খবর দিয়েছেন, চুক্তির অনুলিপি প্রস্তুত। কিন্তু কি আছে চুক্তিতে? এই তথ্য প্রকাশে রাজি নন মন্ত্রণালয়ের ছোট বড় কোনো কর্মকর্তাই।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে যেভাবে টিকফা করা হয়েছে বাংলাদেশেও তার চেয়ে খুব আলাদা কিছু হবে না। মূলত নিজেদের আধিপত্যবাদী বাণিজ্যনীতি অবাধে বাস্তবায়নের জন্য এ ধরনের একটি চুক্তিতে অন্য দেশগুলোকে আবদ্ধ রাখাটাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। টিকফা স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে তাদের মূলনীতি হচ্ছে, চুক্তিবদ্ধ দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারবে না। ইতোমধ্যে তারা পাকিস্তান, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ইরাক, উরুগুয়েসহ বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নেতা হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তৃতীয় বিশ্বের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করে। তাই বাংলাদেশকে কব্জা করাটা খুবই দরকারি। পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিপরীতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার জন্য এসব ফোরামে বাংলাদেশ যাতে কোনো ভূমিকা না রাখতে পারে সেজন্য বাংলাদেশকেও টিকফা চুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে যুক্তরাষ্ট্র।
এর বাইরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সামরিক সহযোগিতা। টিকফা বাণিজ্য বিষয়ক চুক্তি হলেও বাণিজ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন ধরেই এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলে জুড়ে দিয়েছে সামরিক সহযোগিতার প্রশ্নটি। দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সামরিক মিত্র হিসেবে পেতে চায়। টিকফার মধ্য দিয়ে এই রাস্তা অনেকটাই খুলে যাবে। বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মার্কিন বলয়ের ওপর অনেক বেশি নির্ভর হয়ে পড়বে। অর্থনৈতিক নানা ইস্যুতে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কথা মেনে চলতে হবে। যার ফলে চীন-ভারতকে নিয়ে মার্কিন উদ্বেগের একটা সহজ সমাধানও বেরিয়ে আসতে পারে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ হবে মার্কিনীদের আশ্রয়ভূমি- পাকিস্তান, সৌদি আরব, কুয়েতের মতো।

টিকফায় বাংলাদেশের ক্ষতি
চুক্তির বিধিবিধানগুলো স্পষ্ট করে বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে অকেজো একটি রাষ্ট্রে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে এর মধ্যে। পুরো দেশের সেবাখাত বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে চলে যাবে। তাদের অবাধ মুনাফা নিশ্চিত করতে গিয়ে দেশের মানুষকে আরও নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হতে হবে। দাম বাড়বে প্রত্যেক সেবাখাতের। পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারগুলো হয়ে যাবে পণ্য। সরকার যে কম মূল্যে জনগণকে এসব সুবিধা দেয় তা আর চালু থাকবে না। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনধারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে।
এই চুক্তির কারণে দেশীয় শিল্পকে কোনো বিশেষ সুবিধা দেয়া যাবে না। বড় একচেটিয়া বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছে ছোট স্বল্প পুঁজির দেশি কোম্পানিগুলো টিকতে পারবে না। ধীরে ধীরে বসে যাবে নিজস্ব শিল্প। কৃষিখাতে ভর্তুকি না দেয়া গেলে এই খাত ক্রমশ কৃষকের গণ্ডির বাইরে চলে যাবে। ধ্বংস হবে নিজস্ব খাদ্যোৎপাদন ব্যবস্থা।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, ‘উদারনীতি ও মুক্তবাজারের ফলে নিজস্ব বাজার ব্যবস্থার পুরোটাই চলে যাবে বিদেশিদের হাতে। বিশাল শিল্পোন্নত দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা উন্নত ও বড়। তাই উৎপাদনে তাদের ব্যয় কম। বাংলাদেশের উৎপাদিত অনেক পণ্যই সেই তুলনায় বেশি খরুচে। এসব পণ্য আর বাজারে টিকতে পারবে না। যেমন, ব্রাজিল থেকে উন্নতমানের চিনি আমদানি করে একজন মার্কিন ঠিকাদার তা বাংলাদেশে ২০ টাকা কেজিতে বিক্রি করে লাভ করতে পারবে। কয়েক টাকা কম দামে চিনি পেলেও এতে ধ্বংস হয়ে যাবে আমাদের বিশাল অর্থনৈতিক চক্র। প্রথমে ধ্বংস হবে চিনির বাজার। তারপর বন্ধ হবে চিনির কল। এরপর বন্ধ হবে আখচাষ। পথে বসবে আখচাষি, চিনিকলের শ্রমিক ও এর সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত অসংখ্য মানুষ। এসব দিক বিবেচনা করেই এগুতে হয় একটি স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রকে। টিকফা হলে বিনিয়োগ আসতে পারে। তবে তার পুরোটাই এমন সব খাতে, যার মাধ্যমে আমাদের নিজস্ব অর্থনীতি কেবল ক্ষতিগ্রস্তই হবে।’
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের পণ্যের দাম বেশি পড়ছে ওদিকে কম পড়ছে এর কারণটাও কিন্তু তাদেরই তৈরি করা। যুক্তরাষ্ট্র নিজে বাণিজ্য সংরক্ষণ নীতিতেই চলছে। নিজস্ব কৃষি ও শিল্পকে সে বিশেষ সুবিধা দেয়। অন্য দেশের পণ্য সেদেশে ঢুকে ব্যবসা করে টিকে থাকতে বাধা-বিপত্তির শেষ নেই। দোহা এজেন্ডা অনুযায়ী বাংলাদেশ কৃষিতে ৫ শতাংশের বেশি ভর্তুকি দিতে পারছে না। অথচ যুক্তরাষ্ট্র নিজে কৃষিতে ১৯ শতাংশের বেশি ভর্তুকি দিয়ে তাদের কৃষি ব্যবস্থাকে সুরক্ষা দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্যের দাম পড়ছে বেশি।'
এসবের বাইরে আছে মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর বাস্তবায়ন। এটা হলে বাংলাদেশের বিকাশ অনেকটা বাধাগ্রস্ত হবে। প্রযুক্তি খাতে অধিকাংশ পণ্যই আমরা পাইরেটেড কপি ব্যবহার করে থাকি। লাইসেন্সড কপি কিনতে গেলে একটি অনুন্নত দেশের নাগরিক হিসেবে এখানকার ভোক্তাদের যে ব্যয় দাঁড়াবে তা বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। গুটিকয়েক মানুষ ব্যতীত অন্যরা প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর সুবিধা থেকে ছিটকে পড়বেন।
দোহা ঘোষণা ২০০০ অনুযায়ী বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার আওতায় বাণিজ্যবিষয়ক মেধাসম্পদ স্বত্ব চুক্তি অনুসারে স্বল্পোন্নত সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৩ সালের পর বিভিন্ন পণ্য ও সেবা এবং ২০১৬ সালের পর ওষুধের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ববিষয়ক বিধিনিষেধে আবদ্ধ হবে। এরপর আর পেটেন্ট করা ওষুধ উৎপাদন এবং রপ্তানি করা যাবে না। অন্যের পেটেন্ট করা কিছু ব্যবহারের আগে কিনতে হবে। টিকফায় ২০১৩-২০১৬’র কোনো ব্যাপার নেই। চুক্তি হলেই শুরু মেধাস্বত্বের বাস্তবায়ন। অর্থাৎ এতে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প, কম্পিউটার-সফটওয়্যারসহ গোটা তথ্যপ্রযুক্তি খাত যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর পেটেন্ট, কপিরাইট, ট্রেডমার্ক ইত্যাদির লাইসেন্স খরচ বহন করতে গিয়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। বিভিন্ন পণ্য এবং প্রযুক্তির দাম অভাবনীয়ভাবে বেড়ে যাবে।
মেধাস্বত্ব আইন কার্যকর হলে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো অনেক ওষুধ তৈরি করতে পারবে না। কয়েকগুণ বেশি দামে বিদেশি কোম্পানির পেটেন্ট করা ওষুধ কিনতে হবে। দরিদ্ররা বঞ্চিত হবে চিকিৎসা সেবা থেকে। শুধু তাই নয় যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী কোনো কিছুর যদি পেটেন্ট না হয়ে থাকে তাহলে তা যে কেউ পেটেন্ট করে নিতে পারবেন। এই হিসেবে নিম গাছের পেটেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের। বাংলাদেশ, ভারত, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের নিজস্ব জীববৈচিত্র্যের অনেক জীব-অণুজীব এবং উদ্ভিদ প্রজাতি এখন যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পেটেন্টের দখলে। টিকফা কার্যকরের পর এসব পেটেন্টকৃত জিনিস ব্যবহার করতে গেলে পেটেন্টকারীকে রয়্যালিটি দিতে হবে। অনুমতি ছাড়া তা মজুদ করা যাবে না। কৃষিতে পেটেন্ট বাস্তবায়ন হলে কৃষকদের শস্যবীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ, পুনরুৎপাদন এবং রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার কেড়ে নেয়া হবে।
টিকফায় পণ্য ও পুঁজির চলাচলকে অবাধ করার কথা এবং সেই সূত্রে মুনাফার শর্তহীন স্থানান্তরের গ্যারান্টির কথা বলা হলেও শ্রমশক্তির অবাধ যাতায়াতের সুযোগের কথা কিছুই বলা হয়নি। অথচ শ্রমশক্তিই হলো আমাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মূল্যবান সম্পদ। যা রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে বিপুল আপেক্ষিক সুবিধা। কিন্তু সে ক্ষেত্রে ‘মুক্তবাজার’ নীতিটি যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োগ করতে রাজি নয়। তারা তা প্রয়োগ করতে প্রস্তুত শুধু পুঁজি, পণ্য ও সেবা-পণ্যের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ যেক্ষেত্রে তারা এগিয়ে আছে।

সরকারি বক্তব্য
অনেকে মনে করেন টিকফায় আমরা লাভবানও হতে পারি। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমার মনে হয়, টিকফা হলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে। অন্তত একটি প্লাটফর্ম তৈরি হবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুবিধার বিষয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য। বর্তমানে যা নেই। অনেক দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের চুক্তি করেছে এবং কারও স্বার্থহানি হয়েছে বলে শোনা যায়নি। তবে বাংলাদেশ অবশ্যই তার নিজের স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই টিকফা চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে। বাংলাদেশের উচিত হবে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সক্ষম হওয়া। তাহলে অন্য অনেক দেশ থেকে তো বটেই, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যেতে পারে।’
পররাষ্ট্রসচিব মো. শহিদুল হকের বক্তব্যও একই ধাঁচের। তিনি বলেন, ‘সরকার কোনো ধরনের মতপার্থক্যের মধ্যে আমেরিকার সঙ্গে টিকফা সই করবে না। আমাদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী টিকফা সই হলে দেশ লাভবান হবে। টিকফার ক্ষতিকর দিক নিয়ে যা বলা হয় তার অধিকাংশই প্রচারণা। এতকিছু ঘটলে তো যেসব রাষ্ট্র এই চুক্তি ইতোমধ্যে করেছে তারা বিলুপ্ত হয়ে যেত।’
বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদেরের কণ্ঠেও একই সুর। তিনি বলেন, দ্রুতই আমরা চুক্তিটি স্বাক্ষর করতে চাই। এর মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বাড়বে। চুক্তিতে দেশের জন্য ক্ষতিকর আমি কিছু দেখিনি। মেধাস্বত্বের বিষয়টিতে আমরা সময় চেয়েছি। তবে মেধাস্বত্বের প্রয়োজনীয়তাও আছে। এখন সারা বিশ্বেই জনগণের উন্নয়নের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য উদারীকরণ করা হচ্ছে। আমাদের দেশেও ব্যবসা-বাণিজ্য উদারীকরণ করা হচ্ছে। আগে জনগণের উন্নয়ন করতে যুদ্ধ করতে হতো। কিন্তু এখন সেটা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে করা হচ্ছে। তাই ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত করতে হবে।’
ক্ষতিকর না হলে চুক্তি গোপন রাখা হচ্ছে কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক তৈরিতে এ ধরনের চুক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র অন্যদের সঙ্গে অন্যভাবে করেছে। আমাদের অনেক বেশি ছাড় দিচ্ছে। তাই এটা প্রকাশ করাটা দুই দেশের জন্যই ক্ষতিকর হবে। এসব বিষয় বিবেচনা করেই চুক্তি প্রকাশ করা হচ্ছে না।’
চুক্তি এখন কি অবস্থায় আছে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘সব প্রস্তুত। অচিরেই ঘোষণা শুনতে পাবেন।’

শেষ কথা

টিফা-টিকফা অনেকদিনের আলোচিত বিষয়। চুক্তির নাম বদল হলেই এর ভেতরের সারবস্তু বদলে যায় না। এই চুক্তির সারবস্তু মূলত দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনস্ততার দিকেই ঠেলে দেয়া। তাই দেশের বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ সচেতন নাগরিক পর্যন্ত আমরা সবাই এ চুক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন। অতীতে গোপন চুক্তি দেশের ক্ষতি ছাড়া ভালো কিছু করেনি। তাই চুক্তি স্বাক্ষরের আগে তা প্রকাশ করা ও এর ওপর উন্মুক্ত আলাপ, মতবিনিময়ের ব্যবস্থা নেয়া। সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় স্বার্থবিরোধী যে কোনো প্রবণতাকে বাতিল করতে হবে। নইলে গণবিরোধী এসব সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মানুষ লড়াই গড়ে তুলতে সময় নেবে না।