Saturday, February 18, 2017

স্বাধীনতার বীজ বুনা ছিল যেখানে

এই পৃথিবীর প্রতিটি জাতিতার ভাষা দ্বারা অনুপ্রানীত। কিন্তু খুব কম সংখ্যক জাতিই তার ভাষা থেকে জন্মেছে। বাংলাদেশের বাঙ্গালীরা তার মধ্যে অন্যতম।
আপনি কি জানেন একবার একটি ভাষা ও গুলির মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল? আপনি কি জানেন কোন পক্ষ জিতেছিল? একটু ভাবুন!!!!
এই লড়াইটা শুরু ১৯৪৭ ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই। তখন বাংলাদেশর নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান।

 শরিফুল হাসান সমাপ্ত 


প্রথম পর্যায়
১৫ ই সেপ্টেমবর, ১৯৪৭:  ইসলামি আদর্শে অনুপ্রাণিত লেখক, সাংবাদিক ও বিদ্দজ্জনদের সংগঠন তামুদ্দুন মজলিস বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করার দাবী করে। নভেম্বর, ১৯৪৭: করাচিতে বাঙ্গালি শিক্ষা মন্ত্রী ফজলুর রহমানের ডাকা পাকিস্তান এডুকেশনাল কনফেরেন্সে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধিরা উর্দূকে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা হিসেব গণ্য করার বিরোধিতা করলেন।
২৩ শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৪৮: পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নকালে ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত উর্দূ ও ইংরাজির সঙ্গে বাংলাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার জন্য প্রস্তাব আনেন কিন্তু অন্যান্য অবাঙ্গালিরা প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেন। বাঙ্গালি আমলা, শিক্ষাবিদ, ছাত্র এবং মধ্যবিত্তদের অন্যান্য অংশের সমর্থনপুষ্ট হয়ে বাংলাকে অন্যতম জাতীয় ভাষা করার দাবী শক্তিশালী হয়ে ঊঠল, আর ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই বিতর্ক রাস্তায় নেমে আসে।
মার্চ, ১৯৪৮: প্রথম সপ্তাহে বাম, দক্ষিন ও মধ্য পন্থী--ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব রাজনৈতিক মতাবলম্বী ছাত্ররা মিলে বাংলা ভাষাকে জাতীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে একটি কমিটি গঠন করলেন।
মার্চ ২১, ১৯৪৮: পাকিস্তানের স্রষ্টা এবং প্রথম গভর্নর জেনারেল মহম্মদ আলি জিন্না পূর্ব বাংলা সফরকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেন, "বাংলাকে প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে, কিন্তু উর্দূ ছাড়া অন্য কোন ভাষা রাষ্ট্র ভাষা হতে পারেনা। আপনাদের যারা বিপথে চালিত করার চেষ্টা করছে, তারা পাকিস্তানের শত্রু।"
"তাঁর এই মন্তব্যে অপমানিত বোধ করা বাঙ্গালি যুব সমাজ ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানাল। যাঁরা প্রতিবাদের আওয়াজ তুলেছিলেন এবং আটক হন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন সেই সময়ে বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্র বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
দ্বিতীয় পর্যায়
জানুয়ারি ২৬, ১৯৫২: পল্টন ময়দানে একটি জন সভায় মুখ্য মন্ত্রী নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করলেন একমাত্র উর্দূই রাষ্ট্র ভাষা হতে চলেছে। এই ঘটনার পরেই পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফার ভাষা আন্দোলন শুরু হল।
জানুয়ারি ২৮, ১৯৫২: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রতিবাদ সভায় ছাত্ররা প্রধানমন্ত্রী এবং প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রীদের পশ্চিম পাকিস্তানের বোঁচকাবুঁচকি বাহক আখ্যা দিল।
জানুয়ারি ৩০, ১৯৫২: একটি গোপন বৈঠকে কম্যুনিস্ট জোট ছাড়াও অন্যান্য সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়ে সবাই এক মত হলেন যে, সার্থক ভাবে ভাষা আন্দোলন চালিয়ে যেতে হলে শুধু একা ছাত্ররাই যথেষ্ট নয়, তাই সর্ব স্তরের রাজনৈতিক এবং ছাত্র সমর্থন পেতে জননেতা মওলানা ভাসানির নেতৃত্বে আন্দোলন চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জানুয়ারি ৩১, ১৯৫২: ঢাকায় একটি সর্ব দল বৈঠকে কাজি গোলাম মাহ্‌বুবকে আহ্বায়ক করে এবং মওলানা ভাসানিকে সভাপতি করে একটি সম্প্রসারিত 'অল পার্টি কমিটি অফ অ্যাকশন ' গঠন করা হল।
ফেব্রুয়ারি ৩, ১৯৫২: পূর্ব বঙ্গ জুড়ে 'ভাষা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের' প্রতিবাদে কমিটি অফ অ্যাকশন ঢাকায় একটি প্রতিবাদ সভা ডাকে। আবুল হাশিমের পরামর্শক্রমে ঠিক হয় ২১ শে ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ ইস্ট বেঙ্গল অ্যাসেমব্লির বাজেট অধিবেশন শুরুর দিন, একটি সাধারন ধর্মঘট ডাকা হবে।
ফেব্রুয়ারি ২০, ১৯৫২: সন্ধ্যা ছ'টার সময় ঢাকা শহরে মিছিল এবং মিটিঙের উপর ১৪৪ ধারা অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা জারী হল। এই আদেশ ছাত্রদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিল।
ফেব্রুয়ারি ২১, ১৯৫২: সাধারন ধর্মঘট পালিত হল।
দুপুর--ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামপাসে একটি সভায় ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নেয় মিছিল এবং মিটিঙের উপর ১৪৪ ধারা অমান্য করার।
বিকেল ৪টা
মেডিক্যাল কলেজের হস্টেলের সামনে পুলিশ গুলি চালায়। এতে পাঁচ জন-মহম্মদ সালাউদ্দিন, আব্দুল জব্বর, আবুল বরকত, রফিকুদ্দিন আহ্‌মেদ এবং আব্দুস সালাম নিহত হন। এঁদের মধ্যে প্রথম তিন জন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
ফেব্রুয়ারি ২২, ১৯৫২: হাজার হাজার মানুষ পুলিশের গুলিতে নিহতদের জন্য প্রার্থনা করতে জড় হলেন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ এবং এঞ্জিনীয়ারিং কলেজ প্রাঙ্গণে। প্রার্থনার পর তাঁরা যখন মিছিল করে যাচ্ছেন, তখন পুলিশ আবারো গুলি চালায়। এই ঘটনায় চার জনের মৃত্যু হয়।
ফেব্রুয়ারি ২৩, ১৯৫২: একটি সম্পূর্ন ও স্বতঃস্ফুর্ত সাধারন ধর্মঘট পালিত হয়।
ফেব্রুয়ারি ২৪, ১৯৫২: ঢাকায় ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার পুলিশ আর মিলিটারিকে ঢালাও ক্ষমতা দেয়। এই ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পুলিশ ভাষা আন্দোলনের সাথে যূক্ত প্রায় সব ছাত্র এবং রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার করে। দমন পীড়নের কারনে আন্দোলন ঢাকায় কিছুটা ঝিমিয়ে যায়, কিন্তু ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে।

পরিণতি
 মে ৭, ১৯৫৪: পাকিস্তান সরকার বাংলাকে একটি জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি জানায়।
মার্চ ২৬, ১৯৭১: একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ।
ডিসেম্বর ১৬,১৯৭১: বিজয়ের লাল সবুজ পতাকা

0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home